Dr. Bashir Mahmud Ellias's Blog

Know Thyself

rules and regulations of homeopathic medicines

Leave a comment

ঔষধ নির্বাচন করবেন কিভাবে ? হোমিওপ্যাথি একটি লক্ষণ ভিত্তিক চিকিৎসা বিজ্ঞান। মনে রাখতে হবে যে, রোগের লক্ষণগুলোই হলো রোগের প্রকৃত পরিচয় পাওয়ার একমাত্র রাস্তা। তাই রোগের শারীরিক লক্ষণসমূহ, মানসিক লক্ষণসমূহ এবং রোগীর ব্যক্তিগত লক্ষণসমূহ বুঝতে না পারলে কিংবা গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণগুলি সংগ্রহ করতে না পারলে, সঠিক ঔষধ নির্বাচন করা সম্ভব হয় না। সেক্ষেত্রে হাজার বার ঔষধ পাল্টিয়ে এবং হাজার ডোজ ঔষধ খেয়েও সামান্য ছোটখাট রোগও সারানো যায় না। আবার মারাত্মক অসুখ-বিসুখ কিংবা অনেক বছরেরও পুরনো রোগ-ব্যাধিও মাত্র এক ডোজ ঔষধে নির্মূল হয়ে যায় যদি লক্ষণের সাথে পুরোপুরি মিলিয়ে ঔষধ দেওয়া যায়। রোগের নাম নয়, বরং রোগ এবং রোগীর সমস্ত লক্ষণসমূহের উপর ভিত্তি করে ঔষধ নির্বাচন করতে হবে। কারণ হোমিওপ্যাথিতে রোগের নামে কোন ঔষধ নাই। একই রোগের জন্য সব রোগীকে একই ঔষধ দিলে কোন কাজ হবে না। যেমন ধরুন ডায়েরিয়ার কথা, ডায়েরিয়ার সাথে যদি পেটে ব্যথা থাকে তবে এক ঔষধ আর যদি পেটে ব্যথা না থাকে তবে অন্য ঔষধ। ডায়েরিয়ার ফলে যদি রোগী দুর্বল হয়ে পড়ে তবে এক ঔষধ আর যদি দুর্বল না হয় তবে অন্য ঔষধ। ডায়েরিয়া শুরু হওয়ার কারণের ওপর ভিত্তি করেও ঔষধ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে এবং ব্যথা বা পায়খানার রঙ, গন্ধ, ধরণ বা পরিমাণের ওপর ভিত্তি করেও ঔষধ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।

আপনার রোগের লক্ষণসমূহ যে-ঔষধের মধ্যে সবচেয়ে বেশী পাওয়া যাবে, সেটি হবে আপনার উপযুক্ত ঔষধ। মনে করুন আপনার জ্বর হয়েছে ; যদি দেখেন যে আপনার জ্বরের দুইটি লক্ষণ ব্রায়োনিয়া ঔষধটির সাথে মিলে যায় অন্যদিকে তিনটি লক্ষণ বেলেডোনা ঔষটির সাথে মিলে যায়, তাহলে বেলেডোনাই হবে আপনার উপযুক্ত ঔষধ। আবার শারীরিক লক্ষণের চাইতে মানসিক লক্ষণের গুরুত্ব বেশী। কাজেই যদি দেখেন যে, আপনার শারীরিক লক্ষণসমূহ রাস টক্স ঔষধটির সাথে মিলে যায় কিন্তু মানসিক লক্ষণ একোনাইট ঔষধটির সাথে মিলে যায়, তাহলে একোনাইট ঔষধটি-ই আপনার খাওয়া উচিত। হোমিওপ্যাথিতে একবারে একটির বেশী ঔষধ খাওয়া নিষিদ্ধ।

মনে করুন, আপনার আমাশয় হয়েছে। তো আমাশয় হলে সাথে পেট ব্যথাও থাকে এবং কয়েকবার পায়খানা করলে শরীরে দুর্বলতাও এসে যায়। এক্ষেত্রে এলোপ্যাথিক ডাক্তাররা আপনাকে তিনটি ঔষধ দিবে; একটি আমাশয়ের জন্য, একটি পেটব্যথার জন্য এবং স্যালাইন দিবে দুর্বলতার জন্য। কিন্তু হোমিওপ্যাথিতে যদি ঠিকমতো লক্ষণ মিলিয়ে দিতে পারেন তবে একটি ঔষধেই আপনার আমাশয়, পেট ব্যথা এবং দুর্বলতা সেরে যাবে। এজন্য তিনটি ঔষধ লাগবে না। ভাষাজ্ঞানের অভাবে অবুঝ শিশুরা এবং পশুপাখিরা তাদের অনেক কষ্টদায়ক রোগ লক্ষণের কথা বলতে পারে না। রোগের যন্ত্রণায় বেঁহুশ ব্যক্তিও তাদের কষ্টের কথা বলতে পারে না। এইসব ক্ষেত্রে আমাদেরকে বুদ্ধি খাটিয়ে রোগীর লক্ষণসমূহ আন্দাজ করে নিতে হবে। প্রতিটি রোগের সাথে যতগুলো ঔষধের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তার সবগুলো প্রথমে পড়ে নিন এবং তারপর যে ঔষধটি আপনার রোগ লক্ষণের সাথে সবচেয়ে বেশী মিলে যায়, সেটি খাওয়া শুরু করুন।

ঔষধ কেনার নিয়ম-কানুন ? জার্মানী, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, সুইজারল্যাণ্ড, পাকিস্তান, ভারত প্রভৃতি দেশে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ তৈরী হয়ে থাকে। বাংলাদেশেও প্রায় আটাত্তরটির মতো হোমিওপ্যাথিক ঔষধ প্রস্তুতকারী কোম্পানী আছে। হোমিওপ্যাথিক ঔষধ কেনার সময় দোকানদারকে বলবেন জার্মানীর অথবা আমেরিকান ঔষধ দেওয়ার জন্য। কেননা জার্মানীর এবং আমেরিকান ঔষধের কোয়ালিটির ওপর সবারই আস্থা আছে। হোমিওপ্যাথিক মূল ঔষধটি তৈরী করা হয় তরল আকারে। কিন্তু সেগুলো রোগীদের দেওয়া হয়ে থাকে পানিতে মিশিয়ে, (চিনির) বড়িতে মিশিয়ে, দুধের পাউডারে মিশিয়ে কিংবা অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি মূল ঔষধটিও দেওয়া হয়। তবে সরাসরি মূল ঔষধটি কেনা বা খাওয়া উচিত নয়। কেননা এতে ঔষধ বেশী খাওয়া হয়ে যায়; ফলে তার সাইড-ইফেক্টও বেশী হতে পারে। তাছাড়া শিশির কর্ক টাইট করে লাগাতে ভুলে গেলে ঔষধ উড়ে যায় এবং মুখ খুলে বা শিশি ভেঙ্গে মাটিতে পড়ে গেলে সেগুলো আর উঠানো যায় না। কাজেই ঔষধ চিনির বড়িতে কেনা এবং খাওয়াই বুদ্ধিমানের পরিচায়ক। এক ড্রাম, দুই ড্রাম, হাফ আউন্স, এক আউন্স ইত্যাদি পরিমাণে ঔষধ ক্রয় করবেন।
ঔষধ কেনার সময় এই ভাবে বলতে হবে যে, ডাক্তার সাহেব ! আমাকে অমুক ঔষধটি অমুক শক্তিতে (যেমন Nux vomica 30) বড়িতে এক ড্রাম দেন। (কারণ হোমিওপ্যাথিক ঔষধের যারা ব্যবসা করেন তারা সবাই গভার্নমেন্ট রেজিষ্টার্ড হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার।)

হোমিও ঔষধের মেয়াদ থাকে কত দিন ? মূল হোমিও ঔষধ যা তরল আকারে তৈরী করা হয়ে থাকে, তার কোন এক্সপাইরি ডেট নাই অর্থাৎ এগুলো কখনও নষ্ট হয় না। কেননা মূল হোমিও ঔষধটি ইথাইল এলকোহল বা রেকটিফাইড স্পিরিটে তৈরী করা হয়ে থাকে। আর এলকোহল বা স্পিরিট যেহেতু কখনও নষ্ট হয় না, সেহেতু মূল হোমিও ঔষধও কখনো নষ্ট হয় না। এগুলো আপনি কেয়ামত পযর্ন্ত নিশ্চিনে- ব্যবহার করতে পারবেন। কিন্তু মূল ঔষধটি যখন আপনি চিনির বড়িতে, পাউডারে বা পানিতে মিশিয়ে কিনে আনবেন, সেটি আপনি অনন্তকাল ব্যবহার করতে পারবেন না। কেননা সেগুলো কয়েক বছর পরেই নষ্ট হয়ে যায়। যেমন আপনি একটি ঔষধ চিনির বড়িতে কিনে আনলেন এবং পাঁচ বছর পরে দেখলেন সাদা চিনির বড়িগুলি হলুদ বা লাল বা কালো হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে ঔষধগুলি ফেলে দেওয়া উচিত; কেননা এগুলো যে নষ্ট হয়ে গেছে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।

কত শক্তির ঔষধ খাওয়া উচিত ? হোমিওপ্যাথিক ঔষধের শক্তিগুলো হলো ৩, ৬, ১২, ৩০, ২০০, ১০০০ (বা 1M), ১০০০০ (বা 10M), ৫০০০০ (বা 50M), ১০০,০০০ (বা CM) ইত্যাদি। সবচেয়ে নিম্নশক্তি হলো মাদার টিংচার বা কিউ (Q) এবং ইহার শক্তিকে ধরা হয় শূণ্য (zero)। তাদের মধ্যে ৩, ৬, ১২, ৩০ কে বলা হয় নিম্নশক্তি আর ২০০ শক্তিকে বলা হয় মধ্য শক্তি। পক্ষান্তরে ১০০০, ১০০০০, ৫০০০০ এবং ১০০০০০ কে ধরা হয় উচ্চ শক্তি হিসাবে। নতুন রোগ বা ইমারজেন্সী রোগের ক্ষেত্রে নিম্নশক্তি এবং মধ্যশক্তির ঔষধ সবচেয়ে ভালো কাজ করে। পক্ষান্তরে উচ্চ শক্তির ঔষধ প্রয়োগ করতে হয় অনেক দিনের পুরনো রোগে অর্থাৎ ক্রনিক ডিজিজে। হোমিওপ্যাথির আবিষ্কারক ডাঃ স্যামুয়েল হ্যানিম্যানের মতে, ৩০ শক্তি হলো স্ট্যান্ডার্ড শক্তি। হ্যাঁ, ঔষধের প্রধান প্রধান লক্ষণসমূহের অনেকগুলো যদি রোগীর মধ্যে নিশ্চিত পাওয়া যায়, তবে এক হাজার (1M) বা দশ হাজার (10M) শক্তির ঔষধও খেতে পারেন।

কিন্তু উচ্চ শক্তির ঔষধ অপ্রয়োজনে ঘনঘন খেলে মারাত্মক বিপদ হতে পারে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া উচ্চ শক্তির ঔষধ খাওয়া উচিত নয়। কেননা সেক্ষেত্রে ঔষধের নির্বাচন ভুল হলে বিরাট ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। একই শক্তির ঔষধ সাধারণ একবারের বেশী খাওয়া উচিত নয়। অনেক সময় দ্বিতীয়বার এবং তৃতীয়বার খেলেও উপকার হয়। কিন্তু ইহার পর আর ঐ শক্তির ঔষধে তেমন কোন উপকার হয় না। হ্যানিম্যানের নির্দেশ হলো, প্রতিবার ঔষধের শক্তি বৃদ্ধি করে খেতে হবে। আপনার কাছে যদি একাধিক শক্তির ঔষধ না থাকে, তবে একমাত্রা (এক ফোটা বা ৪/৫ টি বড়ি) ঔষধকে আধা বোতল পানিতে মিশিয়ে প্রতিবার খাওয়ার পূর্বে জোরে দশবার ঝাঁকি দিয়ে ঔষধের শক্তি বাড়িয়ে খান। (সাধারণত হাফ লিটার বা তার চাইতেও ছোট বোতল ব্যবহার করা উচিত। সাধারণত একই বোতলে একবারের বেশী ব্যবহার করা উচিত নয়। তবে অন্য কোন বোতল না থাকলে সেটিকে অবশ্যই সাবান দিয়ে এবং গরম পানি দিয়ে ভালো করে অনেকবার ধুয়ে নেওয়া উচিত।)

ঔষধ কি পরিমাণ খেতে হবে ? পূর্ণ বয়ষ্কদের ক্ষেত্রে ঔষধ বড়িতে খেলে সর্বোচ্চ ৪/৫ (চার/পাঁচ) টি বড়ি করে খাবেন এবং তরল আকারে মূল ঔষধটি খেলে এক ফোটা করে খাওয়াই যথেষ্ট। তের বছর বয়স পযর্ন্ত শিশুদের ক্ষেত্রে ঔষধ বড়িতে খেলে ২/৩ (দুই/তিন) টি বড়ি করে খাবেন এবং তরল আকারে মূল ঔষধটি খেলে আধা ফোটা করে খাবেন। পক্ষান্তরে দুয়েক দিন বা দুয়েক মাসের একেবারে ছোট নবজাতক শিশুকে ঔষধ বড়িতে খাওয়ালে ১/২ (এক/দুইটি) টি বড়ি করে খাওয়াবেন এবং তরল আকারে মূল ঔষধটি খাওয়ালে এক ফোটার চার ভাগের এক ভাগ খাওয়ানোই যথেষ্ট। (এক ফোটা ঔষধকে এক চামচ পানির সাথে ভালো করে মিশিয়ে তার অর্ধেকটি ফেলে দিয়ে বাকী অর্ধেকটি খেলেই আধা ফোটা ঔষধ খাওয়া হবে। তেমনিভাবে এক ফোটা ঔষধকে এক চামচ পানির সাথে ভালো করে মিশিয়ে তার চার ভাগের তিন ভাগ ফেলে দিয়ে বাকীটুকু খেলেই এক ফোটার চার ভাগের এক ভাগ ঔষধ খাওয়া হবে।) কখনও ভাববেন না যে, এতো কম করে ঔষধ খাওয়ালে রোগ সারবে কিনা ? মনে রাখবেন ঔষধ বেশী খাওয়ালে বরং রোগ বেড়ে যেতে পারে। এজন্য বিশেষত শিশুরা মারাত্মকভাবে অসুস্থ হলে তাদেরকে নির্ধারিত পরিমাণের চাইতে বেশী ঔষধ খাওয়াবেন না, তাহলে তাদের রোগ বেড়ে গিয়ে জীবন নিয়ে টানাটানি শুরু হতে পারে।

ঔষধ কিভাবে খেতে হবে ? ঔষধ খেতে হবে প্রধানত মুখ দিয়ে। যত ইমারজেন্সী সমস্যাই হোক না কেন, মুখে খেলেই চলবে। ঔষধের নির্বাচন যদি সঠিক হয়, তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন যে সেটি মুখে খেলেও একেবারে হাই পাওয়ারের ইনজেকশানের চাইতেও অন্তত একশগুণ দ্রুত কাজ করবে। ইনজেকশান দেওয়া, পায়খানার রাস্তা দিয়ে ঔষধ ঢুকানো বা এই জাতীয় কোন শয়তানী সিষ্টেমের হোমিওপ্যাথিতে স্থান নেই। যদি রোগীর দাঁত কপাটি লেগে থাকে বা বমির জন্য ঔষধ গিলতে না পারে, তবে ঔষধ মুখে বা ঠোটের ফাঁকে রেখে দিলেই চলবে। আবার ঔষধকে একটি বোতলে নিয়ে একটু পানির সাথে মিশিয়ে জোরে কয়েকটা ঝাঁকি দিয়ে তার বাষ্প নিঃশ্বাসের সাথে টেনে নিলেও কাজ হবে। আরেকটি পন্তুা আছে, তাহলো ঔষধকে একটু পানিতে মিশিয়ে পরিষ্কার চামড়ার ওপর মালিশ করা (যেখানে কোন চর্মরোগ নেই)। যে-সব শিশু বুকের দুধ খায়, তাদের যে-কোন রোগ-ব্যাধিতে তাদেরকে ঔষধ না খাইয়ে বরং তাদের মা-কে খাওয়ালেও কাজ হবে। শিশুরা বা মানসিক রোগীরা যদি ঔষধ খেতে অস্বীকার করে, তবে তাদেরকে না জানিয়ে দুধ, পানি, ভাত, চিড়া, মুড়ি, বিস্কিট, ইত্যাদির সাথে মিশিয়ে ঔষধ খাওয়াতে পারেন। তাতেও কাজ হবে।

ঔষধ কতক্ষণ পরপর খেতে হবে ? অধিকাংশ নতুন রোগ (acute disease) একমাত্রা হোমিও ঔষধেই সেরে যায়; যদি ঔষধের লক্ষণ আর রোগের লক্ষণ একশ ভাগ মিলিয়ে সঠিক শক্তিতে ঔষধ দেওয়া যায়। কাজেই দ্বিতীয়বার ঔষধ খাওয়ার প্রয়োজন হয় না। ঔষধের এমন অসাধারণ ক্ষমতাকে প্রথম প্রথম অনেকের কাছে যাদুর মতো মনে হতে পারে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে দিনে তিন্তচার বার করে দুই-তিন দিনও খাওয়া লাগতে পারে। ঔষধ খাওয়ার পর যখনই দেখবেন যে, রোগের অবস্থা উন্নতি হইতেছে সাথে সাথে ঔষধ খাওয়া বন্ধ করে দেবেন। আবার যখন দেখবেন যে, রোগের উন্নতি থেমে গেছে অর্থাৎ রোগের অবস্থা আবার খারাপের দিকে যাইতেছে, তখনই ঔষধের আরেকটি মাত্রা খেয়ে নিবেন। তাই বলা যায়, একমাত্রা ঔষধ খাওয়ার পর যদি দশ মিনিট আপনার রোগ ভাল থাকে, তবে দশ মিনিট পরে আরেক মাত্রা ঔষধ খাবেন। পক্ষান্তরে একমাত্রা ঔষধ খাওয়ার পর যদি দশ ঘণ্টা আপনার রোগ ভাল থাকে, তবে দশ ঘণ্টা পরেই আরেক মাত্রা ঔষধ খেতে পারেন। আবার একমাত্রা ঔষধ খাওয়ার পর যদি দশ বছরও আপনার রোগ ভাল থাকে, তবে দশ বছর পরেই দ্বিতীয় মাত্রা ঔষধ খাওয়া উচিত হবে। হোমিওপ্যাথিতে এমন কোন হাস্যকর নিয়ম নেই যে, আপনার রোগ থাকুক বা না থাকুক ঔষধ রোজ তিনবেলা করে সাতদিন খেতেই হবে। অনেকেই বলেন যে, “আমি এক ডোজ ঔষধ খেয়ে পরে আবার খাওয়ার কথা ভুলে গিয়েছিলাম, কিন্তু পরদিন দেখলাম আমার রোগ ভালো হয়ে গেছে ; আমি তো অবাক !”

ঔষধের কাজের জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে ? সাধারণত রোগ যত কষ্টদায়ক হয়, ঔষধ তত দ্রুত কাজ করে। যেমন তীব্র পেট ব্যথা, আঘাতের ব্যথা বা বুকের ব্যথায় দুই থেকে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঔষধের কাজ শুরু হবে। যদি না হয়, তবে আরেক মাত্রা ঔষধ খেয়ে আরো পাঁচ মিনিট অপেক্ষা করতে পারেন। তাতেও কাজ না হলে ঔষধ পরিবর্তন করে লক্ষণ মিলিয়ে অন্য ঔষধ খাওয়া শুরু করুন। অস্ট্রিয়ান হোমিও চিকিৎসা বিজ্ঞানী জর্জ ভিথুলকাসের মতে, ইমারজেন্সী পরিস্থিতিতে ঔষধে কাজ না করলে ঘণ্টায় বিশ বার ঔষধ পরিবর্তন করতে পারেন। তবে সাধারণ ক্ষেত্রে ঔষধের কাজ বুঝার জন্য চার/পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করা উচিত। যেমন কারো সাতদিন যাবত সর্দি বা কাশি লেগে আছে, এসব ক্ষেত্রে ১০ মিনিটে রোগমুক্ত হওয়ার আশা করা ঠিক হবে না। বরং রোজ তিন/চার বার করে (কমপক্ষে) তিনদিন ঔষধ খাওয়ার গাইড লাইন অনুসরণ করা যেতে পারে। তবে ইমারজেন্সী সমস্যায় ঔষধের একশানের আশায় ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করে রোগের যন্ত্রনা ভোগ করা কিছুতেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।

কিভাবে বুঝতে পারব যে, ঔষধের নির্বাচন ভুল হয়েছে ? ঔষধ খাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পরেও যদি তার কোন ইতিবাচক ফল শরীরে বা মনে প্রকাশ না পায়, তবে বুঝতে হবে যে ঔষধটির নির্বাচন ভুল হয়েছে অর্থাৎ রোগ এবং রোগীর লক্ষণের সাথে ঔষধের লক্ষণ সম্পূর্ণভাবে মিলে নাই। এইক্ষেত্রে নতুন করে চিন্তা করে অন্য একটি ঔষধ নির্বাচন করুন যার সাথে রোগ এবং রোগীর লক্ষণসমূহের ভালো মিল আছে।

ঔষধ নির্বাচন ঠিক আছে কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না ? যদি দেখেন যে, লক্ষণ অনুযায়ী ঔষধের নির্বাচন সঠিক হয়েছে কিন্তু একমাত্রা খাওয়ানোর পরে যথেষ্ট সময় অতিবাহিত হলেও কোন কাজ হচ্ছে না অথবা একটু উন্নতি হয়ে তারপর থেমে গেছে। এইক্ষেত্রে আরেক মাত্রা ঔষধ খেয়ে নিন, তাতে কাজ হতে পারে। এমনকি প্রয়োজনে একটু পরে তৃতীয় আরেক মাত্রা খেয়ে দেখতে পারেন। কেননা অনেক সময় দেখা যায় একটি ঔষধ প্রথমবার খাওয়ার পরে কোন কাজ করে নাই কিন্তু একই ঔষধ একই শক্তিতে একই পরিমাণে দ্বিতীয়বার বা তৃতীয়বার খাওয়ার পরে কাজ শুরু হয়। আরেকটি সমাধান হলো, কয়েকটি বড়িকে আধা গ্লাস পানিতে মিশিয়ে চামচ দিয়ে ভালোভাবে নেড়ে সেখান থেকে কিছুক্ষণ পরপর এক চুমুক করে পান করুন। এতে কাজ হতে পারে; কেননা মাঝে মধ্যে দেখা যায় একই ঔষধ শুকনা বড়িতে খাওয়ায় কাজ হয় না কিন্তু পানিতে মিশিয়ে খেলে কাজ করে। সর্বশেষ সমাধান হলো ঔষধের শক্তি বাড়িয়ে খাওয়া, কেননা রোগের শক্তির চাইতে ঔষধের শক্তি কম হলে সেটি রোগকে নির্মূল করতে পারে না। যেমন আপনি হয়ত ৬ শক্তির ঔষধ খাচ্ছিলেন, তার বদলে ৩০ শক্তিতে খাওয়া শুরু করুন।

ঔষধ খেয়ে রোগ বেড়ে গেলে কি করব ? ঔষধ খাওয়ার পরে রোগ বেড়ে গেলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; কেননা ইহা একটি শুভ লক্ষণ। ঔষধ খাওয়ার পরে রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থ হলো ঔষধের নির্বাচন সঠিক হয়েছে, রোগের শক্তির চাইতে ঔষধের শক্তি একটু বেশী হয়েছে আর এই কারণে আপনার রোগ নিশ্চিতভাবে সেরে যাবে। যারা খুব সেনসিটিভ রোগী তাদের ক্ষেত্রে মাঝে মধ্যে ঔষধ খাওয়ার পরে অল্প সময়ের জন্য রোগের লক্ষণ বৃদ্ধি পেতে দেখা যায়। দুই কারণে ঔষধ খাওয়ার পরে রোগ বেড়ে যেতে পারে – ঔষধের শক্তি দরকারের চাইতে বেশী হলে কিংবা ঔষধের পরিমাণ দরকারের চাইতে বেশী হলে। যেমন – ৬ শক্তি যেখানে যথেষ্ট সেখানে ২০০ শক্তি খাইলে অথবা ২ টি বড়ি খাওয়া যেখানে যথেষ্ট সেখানে ৫/১০টি বড়ি খাইলে। সে যাক, ঔষধ খেয়ে রোগ বেড়ে গেলে সাথে সাথে ঔষধ খাওয়া বন্ধ করে দিন। অল্প সময়ের মধ্যে রোগের তীব্রতা কমতে শুরু করবে। রোগের তীব্রতা কমে আসার পরেই কেবল প্রয়োজন হলে আবার এক ডোজ ঔষধ খেতে পারেন। হ্যাঁ, ঔষধের কারণে রোগ বেড়ে গেলেও তাতে রোগীর কষ্ট তেমন একটা বাড়ে না কিংবা বলা যায় তাতে রোগীর কোন ক্ষতি হয় না।

ঔষধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া এবং বিষক্রিয়া ? হোমিওপ্যাথিক ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কম বা সাইড ইফেক্ট নাই বলে যে একটি কথা প্রচলিত আছে, এটি পুরোপুরি সত্য নয়। কেননা যুক্তির কথা হলো, যার ইফেক্ট আছে তার সাইড ইফেক্টও আছে ; যার একশান আছে তার রিয়েকশান থাকাটাই যুক্তিসঙ্গত। সংক্ষেপে বলা যায়, নিম্নশক্তি এবং মধ্যমশক্তিতে (৩, ৬, ৩০, ২০০) ভুল ঔষধ যদি কেউ দু-চার-দশ মাত্রাও খেয়ে ফেলেন, তাতেও বড় ধরণের কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নাই। পক্ষান্তরে উচ্চ শক্তিতে (১০০০ থেকে উপরের শক্তি) ভুল ঔষধ যদি একমাত্রাও খেয়ে ফেলেন, তাতেও বড় ধরণের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। ভুল ঔষধ সেবনের ফলে কোন সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত হোমিওপ্যাথিক বিষেশজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তাছাড়া হোমিওপ্যাথিক মেটেরিয়া মেডিকা বই দেখে সেই ঔষধের ক্রিয়ানাশক (antidote) ঔষধ খেয়ে নিতে পারেন।

খাবার-পানীয় সংক্রান্ত নির্দেশনা ? হোমিওপ্যাথিক ঔষধ সেবনকালীন সময়ে খাবার-পানীয় সংক্রান্ত উল্লেখযোগ্য কোন নিষেধাজ্ঞা নাই। অর্থাৎ এটা খাওয়া যাবে না, ওটা খাওয়া যাবে না – এরকম কোন বাধাধরা নিয়ম নাই। নিয়ম যা আছে তা হলো, খালিপেটে ঔষধ খাওয়া ভালো। তাই বলে ভরাপেটে ঔষধ খেলে যে, ঔষধে কাজ করবে না এমন নয়। খালিপেটে ঔষধ খেতে ভুলে গেলে ভরাপেটেই খেয়ে নিন, কোন অসুবিধা নেই। (বিঃ দ্রঃ-কাঁচা পেয়াজ, কাঁচা মরিচ, আদা, লেবু, চা, কফি, মদ, খাবার স্যালাইন ইত্যাদি ঝাঝালো খাবার অনেক সময় কিছু কিছু হোমিও ঔষধের একশান নষ্ট করে দেয়। কাজেই এগুলো বর্জন করাই উত্তম অথবা হোমিও ঔষধ খাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে কিংবা এক ঘণ্টা পরে খেতে পারেন।)

অন্য ধরণের ঔষধ এক সাথে খাওয়া যাবে ? এলোপ্যাথিক, ইউনানী, আয়ুর্বেদীয় প্রভৃতি যে-কোন ঔষধের সাথে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ খেতে পারেন। এতে হোমিওপ্যাথিক ঔষধের সাথে সেগুলোর আন্তক্রিয়া (interaction) হওয়ার তেমন কোন সম্ভাবনা নেই। মাত্রাতিরিক্ত রিফাইন করার কারণে হোমিও ঔষধের বস্থগত অসি-ত্ব বিলীন হয়ে যায় এবং সেগুলো শক্তিতে পরিণত হয়ে যায়। আর বাস্তবতা হলো বস্থ এবং শক্তির মধ্যে সাধারণত রিয়েকশন হয় না। হ্যাঁ, যদি কখনও হোমিও ঔষধ অন্যান্য ঔষধের সাথে রিয়েকশান করে থাকেও, তবে সেটা হাজারে দু’এক ক্ষেত্রে। বাস্তবে অনেকেই জন্মনিয়ন্ত্রণ, ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেসার ইত্যাদির এলোপ্যাথিক ঔষধের সাথে হোমিওপ্যাথিক ঔষধ খেয়ে থাকেন। তাতে হোমিও ঔষধের কাজে কোন বাধা সৃষ্টি হয় না। তবে সতর্কতা হিসেবে হোমিও ঔষধটি অন্যান্য ঔষধ খাওয়ার অন্তত দশ মিনিট আগে খেয়ে নেওয়া ভালো হবে।

ভুল ঔষধের ক্ষতি থেকে বাঁচার উপায় কি ? মনে করুন, আপনি ডায়েরিয়ার জন্য একটি ঔষধ খেলেন। তাতে ডায়েরিয়া তো ভালো হলোই না, বরং মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেছে। এই ধরণের ঘটনায় বুঝতে হবে যে, আপনার ঔষধ নির্বাচন সঠিক হয়নি। এখন ভুল ঔষধের উৎপাত থেকে বাঁচার জন্য একই ঔষধ পূর্বের তুলনায় অর্ধেক কমিয়ে পুণরায় আরেক মাত্রা খান। তাতে ভুল ঔষধ খাওয়ার সাইড ইফেক্ট থেকে মুক্তি পেয়ে যাবেন। যেমন প্রথম বার যদি পাঁচটি বড়ি খেয়ে থাকেন তবে দ্বিতীয়বার দুইটি বড়ি খান কিংবা প্রথমবার যদি এক চুমুক ঔষধ খেয়ে থাকেন তবে দ্বিতীয়বার আধা চুমুক খান। তাছাড়া ক্যামেফারা (Camphora) নামক হোমিও ঔষধটিও খেতে পারেন। কেননা এটি শতকরা নব্বই ভাগ হোমিও ঔষধের একশান নষ্ট করে দিতে পারে।

ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, সতর্কতা এবং নিষেধাজ্ঞা ঃ-
* কষ্টিকাম (Causticum) ঔষধটিকে কখনও ফসফরাসের (Phosphorus) আগে বা পরে ব্যবহার করবেন না।
* বিশেষত Sulphur, Silicea, Psorinum, Phosphorus, Lachesis, Kali carb, Graphities, Carcinosinum নামক ঔষধগুলি ভুলেও উচ্চশক্তিতে খাবেন না। কেননা এতে রোগ বেড়ে যেতে পারে মারাত্মকভাবে এবং তাছাড়াও অন্য ধরণের বিরাট ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
* লাইকোপোডিয়াম (Lycopodium) নিম্নশক্তিতে দীর্র্ঘদিন ভুল প্রয়োগে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এমনকি মৃত্যু পযর্ন্ত হতে পারে।
* হ্যানিম্যানের মতে, সালফারের (Sulphur) পূর্বে ক্যালকেরিয়া কার্ব (Calcarea Carbonica) ব্যবহার করা উচিত নয়। (এতে শরীর মারাত্মক দুর্বল হয়ে যেতে পারে।)
* মার্ক সল (Mercurius solbulis) এবং সিলিশিয়া (Silicea) ঔষধ দুটির একটিকে অপরটি (কাছাকাছি সময়) আগে বা পরে ব্যবহার করা উচিত নয়।
* জ্বরের উচ্চ তাপের সময় নেট্রাম মিউর (Natrum mur) ঔষধটি প্রয়োগ করা নিষেধ।
* ক্যাল্কেরিয়া কার্ব (Calcarea Carbonica) ঔষধটি সালফার বা নাইট্রিক এসিডের (Nitricum acidum) পূর্বে ব্যবহার করা নিষেধ।
* লিডাম (Ledum) খেয়ে সৃষ্ট দুর্বলতার চিকিৎসায় চায়না ব্যবহার করা ক্ষতিকর।
* ক্যাল্কেরিয়া কার্ব (Calcarea Carbonica) এবং ব্রায়োনিয়া (Bryonia) শত্রুভাবাপন্ন (inimical) ঔষধ। কাজেই এই দুটিকে কাছাকাছি সময়ে একটির আগে বা পরে অন্যটিকে ব্যবহার করা নিষেধ।
* কোন রোগীর যদি নিদ্রাহীনতা থাকে তবে তাকে রাতের বেলা সালফার (Sulphur) দিতে পারেন। পক্ষান্তরে যেই রোগী ভালো ঘুমায়, তাকে সকাল বেলায় সালফার খাওয়ানো উচিত। কেননা রাতের বেলা সালফার দিলে তার ঘুমে অসুবিধা হতে পারে। নাক্স ভমিকা (Nux vomica) রাতে এবং সালফার সকালে দিতে পারেন যদি তাদের সম্পূরক ক্রিয়া প্রত্যাশা করেন।
* বাম ফুসফুসের ব্যথায় ফসফরাস (Phosphorus) ঔষধটি ঘন ঘন প্রয়োগ করা বিপজ্জনক। কেননা এতে রোগীর তাড়াতাড়ি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে।
* মেডোরিনাম (Medorrhinum) ঔষধটি হৃরোগীদেরকে কখনও উচ্চশক্তিতে দিতে নাই। এতে করে তার হৃদরোগ বৃদ্ধি পেয়ে মৃত্যুর সম্ভাবনা আছে। প্রথমে ২০০ শক্তিতে প্রয়োগ করে তারপর সহ্য শক্তি অনুযায়ী উপরের শক্তি প্রয়োগ করা যেতে পারে।
* কলিনসোনিয়া ক্যান (Collinsonia canadensis) ঔষধটি হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে কখনও নিম্নশক্তিতে প্রয়োগ করতে নাই।
* Apis, Lac defloratum, Gossipium, Pulsatilla, Pinus lamb ইত্যাদি ঔষধ গর্ভবতীদের দেওয়া নিষেধ। কেননা এতে গর্ভ নষ্ঠ হয়ে যেতে পারে।

Author: bashirmahmudellias

I am an Author, Design specialist, Islamic researcher, Homeopathic consultant.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s